ঘরে ফেরা

দুই ঘরের এই বাসাটায় শাহীন, রিজু, জাহাঙ্গীর, মজনু সহ আরো প্রায় ১০-১২ জন থাকে। দু-এক মাস পরপরই এখানে নতুন কেও এসে যুক্ত হয়, কেও ছেড়ে চলে যায়, আবার কেও ঘুরেফিরে বারবার আসে। এদের প্রায় সবার বাড়িই গাইবান্ধা।

সবাই রাজমিস্ত্রী। অন্যের জন্য ঘর-বাড়ি-দালান বানা কিন্তু নিজেরাই এই ছোট ঘরটায় থাকে। বর্ষায় একটু বেশি বৃষ্টি হলেই ঘরের ভিতর পানি চলে আসে। তখন তাদের কাজের জন্য কেনা কাঠ বাসগুলোকেই জোড়া দিয়ে খাটের মত একটা কিছু বানানো হয় শুকনা বিছানায় ঘুমানোর জন্য। রান্নাবান্না একজন বুয়া করে। বাজার একেকদিন একেকজন। মাসে দুই-একদিন ভালো খাবারের আয়োজন করার চেষ্টা থাকে।

শাহীন, জাহাঙ্গীর আর মজনু আজ বাড়ি যাবে। জাহাঙ্গীর কেবল এক মাস হবে আসলেও মজনু আর শাহীনের আড়াইমাসের মত হয়ে গেছে বাড়ি যাওয়া হয়না। গতকালই একটা ছাদ ডালাই হয়েছে, কন্ট্রাক্টর এর কাছ থেকে টাকাপয়সার হিসাব শেষ রাতেই৷ বাড়ি নির্মাতার কাছ থেকেও বাড়তি একটা বকশিস নিয়েছে বাড়ি যাবে বলে।

– এই রিজু পেলাম রে, সাদ্দাম ভাই যাই।
শাহীন এর সাথে কদিন আগেই রিজুর ঝগড়া হয়েছিল তাস খেলার সময়। তার কাছ থেকে তাই আলাদা করে বিদায় নেয়া, আর সাদ্দাম ভাই তার কাজের গুরু।
– যান। গেলে তো আর আসার নাম গন্ধ থাকেনা। একবারে ভুলে যান।
– নাহ। সামনের সপ্তায় চইলা আসমু।
– হ। সামনের সপ্তা!

সবাই জানে কেও ই এক সপ্তাহ পর ফিরবেনা। অন্তত এক মাস। এ দুই-তিন মাসে যা জোগাড় হয়েছে তা দিয়ে যতদিন চলা যায়।

সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শাহীনরা ঘর থেকে বের হয়েছে। রাস্তায় পরিচিত অনেকের সাথে দেখা হয়। সবাইকেই ভুল টুল হয়ে গেলে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য বলে। শেষে বাস কাউন্টারে এসে টিকেট কেনার সময় একটু অহেতুক দামাদামী করে।
জাহাঙ্গীর এর কথা সে কাচপুর নামবে তাও কেন সায়দাবাদ পর্যন্ত যাওয়ার ভাড়া দিতে হবে? জাহাঙ্গীর এর এক আত্মীয়ের বাড়ি কাচপুর। সেখানে একরাত থেকে কাল গাইবান্ধায় যাবে।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য দামাদামি করে লাভ হয়না।

ফার্স্ট ট্রিপের বাসেও আজ ভিড়। তিনজনকে তাই বাসের শেষ মাথায় গিয়ে বসতে হল। এতে অবশ্য তাদের খুব একটা কষ্ট হবেনা। বরং ভালোই হলো একসাথে সারারাস্তা গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। তাদের সাথে আর দুজন বসেছে। দেখে মনে হচ্ছে তারা আলাদাই।

– আপনারা তিনজন কী একসাথে?
মজনু “হ” বলে জানায় তারা একসাথে।
– ও ভালো। না জিজ্ঞেস করলাম অনেক সময়ের যাত্রা তো। মেইনরোডে জাম লাগলে সারাদিন শেষ। একলা তো বইসা থাকলেও সমস্যা।
মজনুর পাল্টা জবাব আপনারা দুইজন কী একসাথে?
– না না, তার তাৎক্ষণিক জবাব।
– ও। হ। যেই জাম পড়ে এখন। ব্রিজের কাজ যে কবে শেষ হইব!
– হ। সমস্যাই। তা আপনেরা নামবেন কই?
– সায়দাবাদ। আমরা দুইজন সায়বাদ আর ওয় নামব কাচপুর। শ্বশুরবাড়ি বেড়াইতে যাইব।

বাস চলতে থাকে তাদের কথা বার্তাও চলতে থাকে। মাঝে মাঝে শাহীন কথা হলে। জাহাঙ্গীর জানালার সাথে বসায় আড্ডায় যোগ দিতে পারছেনা।

এক পর্যায়ে বাস মেইনরোডে উঠে আর জ্যাম শুরু হয়। এই জ্যাম জিনিসটা যাত্রী ড্রাইভারদের জন্য বিরক্তির হলেও চানাচুর-আমড়া-শসা বিক্রেতাদের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। জ্যাম না লাগলে তাদের ব্যবসা অচল। শাহীনদের বাসেও চানাচুর বিক্রেতা উঠে। শাহীন চানাচুর পছন্দ করে। জাহাঙ্গীর, মজনুও নেয়। শাহীন পাশের লোকটাকে জিজ্ঞেস করে সে নিবে কিনা।
লোকটা অসম্মতি জানালে শাহীন হাসতে হাসতে বলে

– ক্যান, অপরিচিত ব্যক্তি দেইখা নাকি?
– আরেহ না। আচ্ছা দেন। এখন তো আর অপরিচিত নাই।

চানাচুর খেতে খেতে তারা বাস-ট্রেনের মলম-পার্টি অজ্ঞান-পার্টি নিয়ে আলোচনা শুরু করে। সেই আলোচনা এক পর্যায়ে রাজনৈতিক-আন্তর্জাতিক আলোচনায় রূপ নেয়।
মজনুর রাজনীতিতে আগ্রহ কম, এক পর্যায়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে। আর জানালার পাশে বসা জাহাঙ্গীরও আলোচনায় যুক্ত হতে না পেরে সুন্দর বাতাসে আরামের ঘুম দেয়।

এদের ঘুম ভাংগে আবার যখন জ্যাম শুরু হয় তখন। এবার শসাওয়ালা উঠেছে। শাহীন শসা নিলেও বাকিরা নেয় নি।
শাহীনের কাছ থেকেই পাশের লোকটা শসার এক টুকরা নেয়।
তাদের আলাপ চলতে থাকে। তাদের মধ্যে বেশ সখ্যতাও হয়ত হয়ে গিয়েছে। কে কোথায় থাকে না থাকে তার আলাপ আলোচনাও শেষ।

জ্যামের মধ্যেই অল্প অল্প করে আগাতে আগাতে কাচপুর চলে আসে। সেখানেই জাহাঙ্গীর এর যাত্রার ইতি। মজনু-শাহীনের পাশাপাশি পাশের লোকটার থেকেও সে বিদায় নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ে।

এর মধ্যেই জ্যাম শেষ হলে বাস পুরো স্পিডে চলতে শুরু করে। তাদের আলাপ অলোচনায়ও একটা বিরতিতে আসে। বাস একটা গ্যাস-স্টেশনে থামলে

– ভাই নামবেন নাকি?
– না। ভাই। আপনি যান।
– মজনু তুই নামবি?
– হ।

মজনু পাশের লোকটাকে তাদের ব্যাগ গুলোর উপর একটু নজর রাখতে বলে শাহীনের পিছনে পিছনে নেমে যায়।

চা খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই বাস-ড্রাইভারের হেল্পার ডাকতে শুরু করে।
“আর কেও আছে?”
“আছে আছে। পিছের সিটে দুইজন আছে।”

মজনু আর শাহীন সিটে ফিরে দেখে সে দুজনের সাথে তাদের ব্যাগ দুইটাও নেই।
তারা একে অপরের দিকে তাকায়। তাদের বুঝতে কষ্ট হয়না যার সাথে সারারাস্তা গল্পগুজব করে এসেছে সে কে? তারা কারা?

মজনু আর শাহীন এর এবারও বাড়ি যাওয়া হল না। আবার কাজে ফিরে যেতে হবে। এক সপ্তাহ পরে না দিনের মধ্যেই তারা তাদের সেই ঘরে ফিরে যায় অন্যের জন্য দালান বানাতে।

জুন ২৯, ২০২০




Enjoy Reading This Article?

Here are some more articles you might like to read next:

  • পঞ্চায়েত - পর্ব ১